শনিবার ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertisement

আলহাজ্ব গোলাম কাদের চৌধুরীর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

মিসেস সামসাত জাহান   |   বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

আলহাজ্ব গোলাম কাদের চৌধুরীর ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

আলহাজ্ব গোলাম কাদের চৌধুরী—কাছ থেকে দেখা এক নির্মোহ, নিরহংকারী ও মুগ্ধতায় ভরা শুদ্ধ মানুষ। বর্ণিল জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর সন্তানবধূ হিসেবে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সেই দীর্ঘ পথচলায় দেখেছি—মানুষ ও মানবতার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, আত্মীয়-পরিজনের প্রতি দায়িত্ববোধ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সততা, নিষ্ঠা এবং নিরলস কর্মস্পৃহা।তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই মানুষটি ছিলেন আপাদমস্তক একজন সাধারণ মানুষ; অথচ তাঁর জীবন, কর্ম ও মানবিকতায় তিনি ছিলেন সাধারণ্যের মাঝে সত্যিই অসাধারণ।

২০২২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরপারের পাড়ি জমান। দেখতে দেখতে চলে যাওয়ার চারটি বছর পূর্ণ হলো। মানুষ চলে যায়; কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্ম, আদর্শ, ভালোবাসা ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে আপনজনের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকেন। আমার শ্বশুর মরহুম আলহাজ্ব গোলাম কাদের চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ।

জীবনভর তিনি নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে মানুষের উপকার করেছেন নিঃস্বার্থভাবে, কিন্তু বিনিময়ে কখনো কৃতজ্ঞতা, প্রশংসা কিংবা প্রতিদানের প্রত্যাশা করেননি। কারও পাশে দাঁড়ানো তাঁর কাছে কোনো মহৎ কাজের প্রচার ছিল না; বরং ছিল একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের স্বাভাবিক দায়িত্ব।

পরিশ্রম, সততা ও একাগ্রতাই ছিল তাঁর জীবনের মূল শক্তি। নিজের যোগ্যতা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ছিলেন স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদাশীল এবং নিজের কর্মেই পরিচিত একজন মানুষ। জীবনে অনেক কিছু পেয়েও নিজের প্রয়োজনকে কখনো বড় করে দেখেননি। সাদাসিধে জীবনযাপন, অল্পে তুষ্ট থাকা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর স্বভাব।

সুস্থতা কিংবা অসুস্থতা—জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতেই তিনি প্রবল মনোবল নিয়ে দিন কাটিয়েছেন। অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর মুখে অভিযোগ খুব কমই শুনেছি। প্রতিকূলতার কাছে নত না হয়ে নিজের মতো করে, নিজের বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পথ চলেছেন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন ১৯৪১ সালের ২৬ অক্টোবর রাউজান উপজেলার ৭ নম্বর ইউনিয়নের জারুলতলা গ্রামে তাঁর জন্ম। মরহুম আব্দুল বারিক চৌধুরীর তিন পুত্র—মরহুম আলহাজ্ব ফজল করিম চৌধুরী, আলহাজ্ব গোলাম কাদের চৌধুরী ও মরহুম আলহাজ্ব গোলাম রব্বানী চৌধুরী এবং চার কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণচঞ্চল, সাহসী ও ডানপিঠে স্বভাবের। খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। বিশেষ করে ফুটবল খেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। তৎকালীন চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচে অংশ নিয়ে তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন।
তিনি মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নিম্ন মাধ্যমিক এবং রাউজান হাইস্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে রাউজান কলেজে এইচএসসি অধ্যয়ন করেন।

ব্যবসায়িক জীবন ও পরিবহন খাতে অবদান
ব্যবসায়িক জীবনে তিনি ছিলেন একজন সফল ও সাহসী পরিবহন ব্যবসায়ী। তাঁর উদ্যোগ ও দূরদর্শিতায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বাস সার্ভিস চালু হয়—‘বন্দর চট্টলা থেকে রাজধানী ঢাকার পথে’—যা সে সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল। জলিলনগর বাসস্ট্যান্ডকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩০ বছর তিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ সময়ে তিনি চট্টগ্রাম-রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাউজান থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সে সময়ে নানা প্রতিকূলতা ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে নিজের বাস দিয়ে রাউজানের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ সুগম করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই উদ্যোগ ও অবদানের উল্লেখ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকাশনাতেও রয়েছে।

মানবসেবায় এক নীরব নিবেদিত প্রাণ

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি রেশন শপের ডিলার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় মানুষের জীবন ছিল নানা অভাব-অনটন ও দুর্দশায় জর্জরিত। সেই কঠিন সময়ে তিনি নিজের অবস্থানকে শুধু ব্যবসার জন্য ব্যবহার করেননি; বরং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
অনেক পরিবারকে তিনি বিনামূল্যে কিংবা অর্ধমূল্যে চাল, ডাল, চিনি, তেলসহ প্রয়োজনীয় রেশনসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর এই মানবিক সহযোগিতার কথা আজও অনেক মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
জীবনের বহু বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাঁর উপকারভোগীদের অনেকে পরিবারের কাছে তাঁর খোঁজ নিয়েছেন, তাঁর কথা স্মরণ করেছেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। মানুষের জন্য নীরবে করে যাওয়া সেই কাজগুলোই আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিহ্ন।

দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের রাজনীতির সঙ্গেও তিনি গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশ গঠন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও সংগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি ব্যক্তিগত অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন সহজ-সরল, সদালাপী, নিরহংকারী ও নির্মোহ একজন মানুষ। ক্ষমতা, অর্থ কিংবা সামাজিক অবস্থান কখনো তাঁকে অহংকারী করে তুলতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের বড় পরিচয় তার অর্থ-বিত্তে নয়, তার কর্মে, ব্যবহারে এবং অন্য মানুষের জন্য সে কতটুকু করতে পেরেছে—সেখানেই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
তাঁর জীবনযাপন ছিল সাধারণ, কিন্তু জীবনবোধ ছিল গভীর। নিজের জন্য কম, অন্যের জন্য বেশি—এভাবেই যেন তিনি তাঁর জীবনকে পরিচালিত করেছেন।

শেষ ইচ্ছা—মসজিদের আজান শুনে ঘুমিয়ে থাকা
তাঁর মনের একটি গভীর বাসনা ছিল কাজী নজরুল ইসলামের সেই আকাঙ্ক্ষার মতো—
“মসজিদের ওই পাশে আমার কবর দিও ভাই,
যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।”

আলহামদুলিল্লাহ, তাঁর সেই শেষ ইচ্ছাটিও পূর্ণ হয়েছে। মসজিদের মেহরাবের পশ্চিম পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। প্রতিদিনের আজানের ধ্বনি যেন আজও তাঁর সেই প্রিয় আকাঙ্ক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়।
কত বিচিত্র এই জীবন! যে মানুষটি সারাজীবন মানুষের পাশে থেকেছেন, শেষ ঠিকানাতেও তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি স্থান—যেখান থেকে মহান আল্লাহর ঘর থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি শোনা যায়।

স্মৃতিতে অমর
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি কি সত্যিই চলে গেছেন? না—তিনি বেঁচে আছেন তাঁর সন্তানদের স্মৃতিতে, স্বজনদের ভালোবাসায়, বন্ধুদের হৃদয়ে এবং সেই অসংখ্য মানুষের কৃতজ্ঞতায়, যাদের জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে তিনি নীরবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে, তাঁর সততায়, তাঁর সরলতায়, তাঁর আত্মমর্যাদায় এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসায়।একজন পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন আশ্রয়,একজন শ্বশুর হিসেবে ছিলেন স্নেহ ও নির্ভরতার প্রতীক,একজন মানুষ হিসেবে ছিলেন অসংখ্য মানুষের ভরসা,আর একজন সমাজসেবী হিসেবে রেখে গেছেন নীরব অথচ গভীর কিছু অবদান। চার বছর পেরিয়ে গেছে। সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর স্মৃতিকে মুছে দিতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করছি—কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর তাঁদের শূন্যতা আরও গভীর হয়ে ওঠে।

আজ তাঁর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশ্রুসিক্ত স্মৃতিতে তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ মরহুম আলহাজ্ব গোলাম কাদের চৌধুরীর সকল গুনাহ ক্ষমা করুন, সকল নেক আমল কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মর্যাদা দান করুন।আল্লাহ যেন তাঁর রেখে যাওয়া সৎকর্মগুলোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন এবং তাঁর উত্তরসূরিদের তাঁর আদর্শ ও মানবিকতার পথে চলার তৌফিক দান করেন।
আমিন।

Facebook Comments Box
আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
এস আই চৌধুরী
পরিচালনা সম্পাদক
আশরাফুল হক আকিব
বার্তা সম্পাদক
আমির হোসাইন
ঢাকা অফিস
  • সুইট নাম্বার ৪০৪/এ (৫ম তলা), পল্টন টাওয়ার, ৮৭, পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা-১০০০
চট্টগ্রাম অফিস