মো: সাইফুল আলম, | শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ৭১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঢাকায় যানজটে বসে থাকা মানুষটি শুধু গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি করছেন না, তিনি প্রতিদিন একটু একটু করে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। এই যে নিরন্তর ক্ষয়, তার হিসাব কোনো সরকারি বাজেটে নেই। অথচ এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক সংকটগুলোর একটি।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে যানজট ও পরিবহন অদক্ষতার কারণে দেশের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিবছর নষ্ট হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশের জন্য এই ক্ষতি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি কাঠামোগত হুমকি।
সমস্যার কেন্দ্রে আছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, সংক্ষেপে বিআরটিএ। এই প্রতিষ্ঠানটি যে পদ্ধতিতে কাজ করছে, তা বহু দশক পুরনো। গাড়ি নিবন্ধন থেকে শুরু করে ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যন্ত প্রতিটি সেবায় নাগরিককে লম্বা সময়, অস্পষ্ট প্রক্রিয়া এবং অনানুষ্ঠানিক খরচের মুখে পড়তে হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক আবেদনকারীর কাছে ঘুষ একটি প্রত্যাশিত ব্যয় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এটি নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র হলেও আসল সমস্যাটি গভীরতর। যখন কোনো প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে জটিল হয়ে ওঠে, তখন মধ্যস্থতাকারীরা সেই ফাঁকটুকু দখল করে নেয়। দুর্নীতি তখন আর ব্যক্তির পাপ থাকে না, সে পরিণত হয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশে।
এই বাস্তবতা পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে বিআরটি এর পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর, যাকে বিআরটিএ ২.০ হিসেবে ভাবা যায়। তবে এই ধারণাটি সাধারণ অর্থে ‘ডিজিটাইজেশন’ নয়। অনলাইনে ফরম পূরণ বা ফি পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি মূল প্রক্রিয়া একই থাকে। বিআরটিএ ২.০ মানে সেবা দেওয়ার দর্শনটাই বদলে ফেলা। একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যদি নাগরিক ঘরে বসে নিবন্ধন করতে পারেন, আবেদনের অবস্থান জানতে পারেন এবং সরকারি দপ্তরে না গিয়েই কাজ শেষ করতে পারেন, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর অস্তিত্বের জায়গাটাই থাকে না।
ব্লকচেইনভিত্তিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। কারণ এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড অপরিবর্তনীয় থাকে, যা অননুমোদিত হস্তক্ষেপকে কার্যত অসম্ভব করে তোলে। ভারতের কয়েকটি রাজ্যে পরিবহন খাতে এই ধরনের ব্যবস্থা চালুর পর সেবা প্রদানে অনিয়মিত লেনদেনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি সরাসরি জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে সংযুক্ত। বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে হাজার হাজার মানুষ মারা যান, তাদের বড় একটি অংশের মৃত্যু ঘটে অদক্ষ চালকের কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনার হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি এবং এর একটি প্রধান কারণ দুর্বল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল সিমুলেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনা করলে চালকের প্রকৃত দক্ষতা, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান অনেক বেশি নিখুঁতভাবে যাচাই করা সম্ভব। ফিনল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ এই পদ্ধতি চালুর পর দুর্ঘটনার হার কমার প্রমাণ পেয়েছে।
যানবাহন শনাক্তকরণে আরএফআইডি প্রযুক্তির ব্যবহার আরও একটি দিক উন্মোচন করে। বর্তমানে জাল নম্বরপ্লেট, কর ফাঁকি এবং অনিবন্ধিত যানবাহনের সমস্যা বিআরটিএর জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা। স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ সহজ হবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়বে। মানুষ যখন দেখে যে আইন সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য, তখন আইন মানার প্রবণতা নিজে থেকেই বাড়তে থাকে।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সেন্সর ও ক্যামেরার ব্যবহার এখন আর পরীক্ষামূলক ধাপে নেই। সিঙ্গাপুর, লন্ডন এবং টোকিওতে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে যানজট নিয়ন্ত্রণ করছে এবং জ্বালানি ব্যবহার কমাচ্ছে। ঢাকায় এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলে মানবিক বিবেচনার নামে যে অনিয়ম হয়, তার সুযোগ কমবে। এটি শুধু যানজট কমাবে না, নগর পরিবেশের মানও উন্নত করবে।
পরিবহন খাতের সংস্কারকে জলবায়ু বাস্তবতা থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা যত দিন টিকে থাকবে, তত দিন শহরের বায়ু দূষণ ও কার্বন নির্গমন কমানো সম্ভব নয়। বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য নীতিগত প্রণোদনা এবং চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা তাই আর কেবল পরিবেশ নীতির বিষয় নয়, এটি পরিবহন সংস্কারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখানে একটি বৈশ্বিক শিক্ষাও আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলে, প্রায়ই তা সীমাবদ্ধ থাকে প্রযুক্তির অবকাঠামো আমদানিতে। কিন্তু রূপান্তরের আসল চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি কেনা নয়, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংস্কৃতি বদলানো। বিআরটিএর ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এলে আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ কীভাবে মোকাবেলা করা হবে, দক্ষতা বাড়ানোর জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ কতটা গুরুত্ব পাবে, এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতদিন অটুট থাকবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিও পুরনো ব্যর্থতার নতুন মোড়কে পরিণত হবে।
বিশ্বের যে দেশগুলো পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কারে সফল হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে একটি সাধারণ সত্য উঠে আসে। সংস্কার তখনই টেকসই হয়, যখন নাগরিক তার সুফল সরাসরি অনুভব করতে পারেন। একটি লাইসেন্স পেতে যদি আর সপ্তাহ না লাগে, যদি জাল নম্বরপ্লেটের গাড়ি রাস্তায় নামার সুযোগ না থাকে, যদি ট্রাফিক আইন ভাঙার ফল তাৎক্ষণিক হয়, তাহলে নাগরিক নিজেই ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ান। সেটাই একটি সংস্কারের প্রকৃত সাফল্য।
বাংলাদেশের সড়ক খাতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট প্রযুক্তির অভাব নয়। সংকট হলো সিদ্ধান্তের অভাব। প্রযুক্তি আছে, উদাহরণ আছে, এমনকি অর্থায়নের সম্ভাবনাও আছে। যা নেই, তা হলো সেই রাজনৈতিক সাহস যা স্বার্থগোষ্ঠীর চাপের মুখে সংস্কারকে সামনে এগিয়ে নিতে পারে। বাংলাদেশ যদি এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে সে শুধু নিজের যানজট কমাবে না, দক্ষিণ এশিয়ার লাখো মানুষের কাছে একটি বাস্তব সম্ভাবনার গল্প বলবে।
মো: সাইফুল আলম,
কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন ।