শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertisement

ঘুম ভাঙার আগেই জেগে ওঠে যে শহর

কাশেম শাহ   |   শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১০২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ঘুম ভাঙার আগেই জেগে ওঠে যে শহর

সকাল সকাল চায়ের জন্য চুলা জ্বালাচ্ছেন এক ক্ষুদ্র বিক্রেতা। ছবি: ফোকাস চট্টগ্রাম

ভোর ছয়টার চট্টগ্রাম আর সকাল দশটার চট্টগ্রাম এক নয়। এই শহর ঘুম ভাঙার আগেই কাজ শুরু করে দেয়। আজানের ধ্বনি শেষ না হতেই কর্ণফুলীর পাড়ে ধোঁয়া ওঠে। চা-পাতিলের পাশে দাঁড়িয়ে কিশোর কিংবা বৃদ্ধ কোনো দোকানি ধীরে ধীরে চায়ের কাপ সাজান। এসব দোকানের কোনো সাইনবোর্ড নেই, তবু প্রতিদিন ঠিকই লোক আসে। কেউ জিজ্ঞেস করে না নাম, শুধু বলে- ‘এক কাপ চা দাও।’ ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি নামে না। আকাশ আর শহরের মাঝখানে এক ধরনের নীলচে ধূসরতা ঝুলে থাকে। সকাল ঢেকে থাকে কুয়াশার চাদরে। এই আলোতেই শুরু হয় চট্টগ্রামের আসল জীবন।

রাস্তায় প্রথম পা ফেলা মানুষগুলো

নগরের ব্যস্ততম এলাকা জিইসি মোড়, আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট, চকবাজার, বহাদ্দারহাট- যেসব জায়গা দিনে মানুষের ভিড়ে দম বন্ধ হয়ে আসে, ভোরে সেখানে অন্য এক চিত্র। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রাতে ছেড়ে আসা বাসগুলোর শেষ গন্তব্য জিইসি মোড়। ভোর ৫টার পর থেকে একের পর এক বাস আসতে থাকে আর সড়কে নামতে থাকে ঘরে ফেরা মানুষ। তাদের জন্য রাতভর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে সিএনজি অটোরিকশা, লোকাল বাস ও টেম্পো। নগরের তিন প্রবেশ পথ এ কে খান মোড়, অলংকার মোড় আর জিইসি মোড়ের চিত্র এমনই। ভোরের আলো আকাশে ডানা মেলার আগেই এখানে জেগে থাকে রাত।
সকাল হতেই অনেকটা একই দৃশ্য দেখা যায় নগরের দক্ষিণ প্রান্তেও। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৭ উপজেলা কর্ণফুলী, পটিয়া, আনোয়ারা, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাঁশখালী আর পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান থেকে নগরের প্রবেশপথ কর্ণফুলী সেতুতে এসে পৌঁছান লোকজন। কেউ বিক্রির জন্য কোনো পণ্য নিয়ে, কেউ বা কর্মস্থলে যোগ দিতে বাস থেকে নেমেই পা বাড়ান গন্তব্যের উদ্দেশে। কেউ কর্ণফুলী সেতুর পাশের দোকানে হয়তো এক কাপ চায়ে চুমুক দেন। আর বান্দরবান কিংবা কক্সবাজারের যাত্রীরা অপেক্ষা করেন কখন বাস ছেড়ে যাবে পর্যটন নগরীর উদ্দেশে। সকাল ৬টায় এখান থেকে রওয়ানা হয় প্রথম বাস।

রাত জেগে থাকে স্টেশন রোডে

নগরের স্টেশন রোডের চিত্রও রাত জাগা গল্পের সঙ্গী। এখানেই চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ফলমন্ডি, অল্প দূর এগুলে বৃহত্তম পাইকারি আড়ত রেয়াজুদ্দিন বাজার। ফলে, রাতভর ট্রাকের পর ট্রাক আসতে থাকে দেশের নানান অঞ্চল থেকে হরেক রকম পণ্য নিয়ে। রাত জেগে অপেক্ষা করলে দেখা যায়, সকালের আলো ফুটার আগেই সবজি/ফলের ঝুড়ি নামানো শুরু করেন পাইকাররা। কলা থেকে মৌসুমী ফল, শাক থেকে শীতের সবজি—সবকিছু নামছে দ্রুত। সময় কম, কারণ ভোর শেষ হলে শহর আর অপেক্ষা করে না।

কুলিদের হাঁকডাক, মূল রাস্তা থেকে পণ্য ভেতরের বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা ভ্যান গাড়ির ব্যস্ততা চোখে পড়ে দীর্ঘসময়। পাশেই হয়তো ভ্যানগাড়িতে থাকা চায়ের স্টলে একটা বনরুটি আর এককাপ গরম চায়ে চুমুক দেয় রাতভর ট্রাক চালিয়ে আসা চালক আর হেলপার।

রিকশাওয়ালারাও এই সময় সবচেয়ে ব্যস্ত। যাত্রী কম, কিন্তু যাদের আছে তারা তাড়া নিয়ে বেরিয়েছে- কেউ হাসপাতালে, কেউ বন্দরে, কেউবা রেল-বাস স্টেশনের উদ্দেশে ছুটছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও কক্সবাজারগামী বাস ছেড়ে যাওয়া শুরু করে ভোর ছয়টায়, আর ঢাকাগামী প্রথম ট্রেন সূবর্ণ এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় ভোর ৭টায়। তবে, তারও আগে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস, সেটি ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। ফলে, রাত শেষ না হতেই যাত্রীদের পদভারে জেগে ওঠে নিউ মার্কেট এলাকার রেলস্টেশন।

ফিশারী ঘাটে ব্যস্ত সকাল

মাছের পাইকারী বিকিকিনির হাট ফিরিঙ্গি বাজার এলাকার ফিশারী ঘাট। সকালের আলো আকাশে মিলাতে শুরু করতেই শ’য়ে শ’য়ে কুলি ঝুড়ি নিয়ে রওয়ানা হয় মাছধরার ট্রলারগুলোর দিকে। সেখান থেকে মাছভর্তি ঝুড়ি নিয়ে কাঠের পাটাতন বেয়ে ট্রলার থেকে নেমে আড়তের দিকে যায় কুলিদের লাইন। ঝুড়ি থেকে বেয়ে পড়া ঠান্ডা পানিতে ভিজতে থাকে সারা শরীর, কিন্তু সেদিকে তাদের নজর দেওয়া চলে না। ফজরের পরপর বিভিন্ন বাজারের পাইকারি মাছ ক্রেতা আর শহরের মানুষজন ঘাটে পৌঁছানোর আগেই নামিয়ে আনতে হবে সব মাছ, নইলে মিলবে না সংসার চালানোর মতো টাকা।

 

ভোরের আলো তখনো ফুটেনি, কুয়াশার চাদরে ঢাকা আকাশ। তারই মাঝে ট্রলার থেকে মাছ নামাতে শুরু করেছেন কুলিরা। চট্টগ্রাম নগরের ফিশারী ঘাটে প্রতিদিন সকালে দেখা মেলে এ দৃশ্যের। ছবি : ফোকাস চট্টগ্রাম

ফিশারি ঘাটে ব্যস্ত সকাল মানে ভোর থেকে শুরু হওয়া মাছের জমজমাট বেচাকেনা। ইলিশ, লইট্টা, চিংড়ি, রূপচাঁদা, কোরাল, লাল-পোয়া, সামুদ্রিক রুই, সুরমা, কাঁকড়া, স্কুইড আরো কত কী। ট্রলার থেকে মাছ আড়তে আনা, ক্রেতাদের ভিড়, দর কষাকষি, বরফ দিয়ে মাছ নামানো —নানা পেশার মানুষের আনাগোনা।

প্রতিদিন ভোররাত থেকে এখানে বিক্রির উদ্দেশ্যে মাছ নিয়ে আসেন জেলেরা। কর্ণফুলীর তীরঘেঁষা এ বাজারে নদীর পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছও ওঠে। চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটের বয়স ২শ বছরেরও বেশি। গভীর সমুদ্র থেকে জেলেরা মাছ শিকার করে নিয়ে আসেন ফিশারি ঘাটে। এরপর ঘাটে হামলে পড়েন মাছ ব্যবসায়ীরা, শুরু হয় বিকিকিনির ধুম। ফিশারি ঘাট থেকে সংগ্রহকৃত মাছ সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতিদিন ভোররাত থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত মৌসুমভেদে কয়েক কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়। চট্টগ্রামের প্রায় ১০ হাজার ফিশিং বোট ও কয়েকশ ট্রলারের আহরিত মাছ বিক্রি হয় এখানে।

চকবাজারে মানুষ বিক্রির হাট

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কাস্তে-কোদাল নিয়ে হাজির শত শত শ্রমিক। তারা সবাই রাজমিস্ত্রি, কাজ করেন ভবন নির্মাণের নানা কাজে। কেউ টানেন ইট-বালু, কেউ বা করেন পাইলিংয়ের কাজ। ভবন নির্মাণ কিংবা ভাঙার দায়িত্বপ্রাপ্ত কন্ট্রাক্টাররা এলে শুরু হয় দরদাম। কতদিনের কাজ, কতজনের কাজ, চুক্তি-দরদাম সবই নির্ধারিত হয় কন্ট্রাক্টারের সাথে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা চকবাজার চকসুপার মার্কেট এলাকায় এ চিত্র দেখা যায় প্রতিদিন।

কথা হয় কাজের জন্য অপেক্ষায় থাকা পঞ্চাশোর্ধ্ব আমিনুল ইসলামের সাথে। ত্রিশ বছর আগে গ্রামের এক চাচার হাত ধরে রংপুরের কাউনিয়া থেকে চট্টগ্রাম শহরে এসেছিলেন যুবক আমিনুল। শুরুতে চায়ের দোকানে কাজ করলেও পরে যুক্ত হন নানা কাজে। শেষ বয়সে করছেন রাজমিত্রির কাজ। আমিনুল জানান, রংপুরে কাজ কম, টাকাও কম। তাই চট্টগ্রামেই পড়ে রয়েছেন কাজের জন্য। বর্তমানে তার ঘর সংসারও এখানে। আমিনুল বলেন, একবার কাজ পেলে কয়েক মাস চলে যায়। আগে করতেন রঙের কাজ। এখন সব রকমের কাজ করেন। কখনো দিনে হাজার টাকা আবার কখনো দিনে ১২০০ টাকা বেতনে কাজ করেন আমিনুল। তবে, বছরের ৩/৪ মাস কোনো কাজ করতে পারেন না। বাড়িতে যাওয়া কিংবা অসুস্থতা লেগেই থাকে।

চা আর কথা, দুটোই গরম

ভোরের চট্টগ্রামে চা শুধু পানীয় নয়, এক ধরনের বিরতি। চায়ের দোকানে বসে দু’জন কথা বলছে—একজন মাছঘাট থেকে ফিরেছে, আরেকজন যাচ্ছে কাজে। আলোচনায় রাজনীতি নেই, বড় খবর নেই। আছে আজকের কাজ, আজকের ভাড়া, আজকের খরচ। আয়ের সাথে ব্যয়ের হিসেব মেলাতে না পারার হিসেব-নিকেশ। চা শেষ হলে সবাই উঠে পড়ে। কারণ এই শহরে ভোর বেশিক্ষণ থাকে না।

সাতটা পেরোতেই শহর বদলাতে শুরু করে। স্কুলগামী শিশুরা আসে, গার্মেন্ট শ্রমিকরা বাসের জন্য অপেক্ষা করে, বাসের হর্ন বাজে, দোকানের শাটার উঠে। ভোরের নীরবতা ভেঙে যায়, কিন্তু তার আগেই যাদের কাজ শেষ হওয়ার কথা—তাদের অনেকটা হয়ে গেছে। এই ভোরেই শহরের অদেখা শ্রম জমা হয়। যার ওপর দাঁড়িয়ে দিনের চট্টগ্রাম। দিনের আলোয় শহর যতটাই ব্যস্ত আর কোলাহলপূর্ণ হোক, তার ভিতরের শিরা-উপশিরায় যে শ্রম বয়ে চলে- তার সূচনা হয় এই ভোরেই। এই শহরকে বুঝতে হলে সকাল নয়, ভোরে উঠে একবার হাঁটতে হয়।

 

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
এস আই চৌধুরী
পরিচালনা সম্পাদক
আশরাফুল হক আকিব
বার্তা সম্পাদক
আমির হোসাইন
ঢাকা অফিস
  • সুইট নাম্বার ৪০৪/এ (৫ম তলা), পল্টন টাওয়ার, ৮৭, পুরানা পল্টন লাইন, ঢাকা-১০০০
চট্টগ্রাম অফিস